শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬, ০৬:৩৭ অপরাহ্ন

শিরোনামঃ
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন: কার্য উপদেষ্টাসহ ৫ সংসদীয় কমিটি গঠন, পর্যালোচনায় আসবে ১৩৩ অধ্যাদেশ ধামরাইয়ে জরাজীর্ণ মিটারে বারবার আগুন: নতুন সংযোগে পল্লী বিদ্যুতের ‘গড়িমসি’, আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা রাষ্ট্রপতির পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও নৈতিকতা: পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল রাজনৈতিক অঙ্গন ইরানে সরকার পতন সম্ভব নয়: ইসরায়েলের ‘অসহায়’ স্বীকারোক্তি হরমুজ প্রণালিতে ৩ জাহাজে ভয়াবহ হামলা: একটিতে আগুন, নাবিকদের উদ্ধার সালথায় আওয়ামী আমলের সারের ডিলার বাতিলের দাবিতে উত্তাল মানববন্ধন ঝুঁকিপূর্ণ মিটারে অগ্নিকাণ্ডের আতঙ্ক: ধামরাইয়ে নতুন সংযোগ দিতে পল্লী বিদ্যুতের গড়িমসি ও মালিকপক্ষের অসহযোগিতার অভিযোগ জমে উঠেছে ইসলামপুর ঈদের বাজার, খুশি ব্যবসায়ীরা ॥

প্রাথমিকে চালু হচ্ছে জিআরআর মূল্যায়ন

অনলাইন ডেস্ক:: প্রাথমিক স্তরে উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিং, বিনামূল্যে বই বিতরণসহ নানান কর্মসূচির কারণে নব্বইয়ের দশকের পর দেশে প্রাথমিক শিক্ষার স্তরে বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি। এরই ধারাবাহিকতায় এক যুগ ধরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার উত্তীর্ণ হয়েছে প্রায় শত ভাগে। যদিও ভর্তি-উপস্থিতির হারে সাফল্য এলেও প্রাথমিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে শিক্ষার্থীদের গুণগত শিক্ষার মানে। শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকলেও অনেক শিশু এখনো মৌলিক পাঠ, গণিত ও ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। এই শিখন ঘাটতি মিটিয়ে শিক্ষার নড়বড়ে ভিত শক্তে এবার মূল্যায়ন পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনছে সরকার। মুখস্থবিদ্যার চিরচেনা পথ ছেড়ে খুদে শিক্ষার্থীদের দক্ষতাভিত্তিক করে গড়ে তুলতে প্রাথমিক শিক্ষায় যুক্ত হচ্ছে আধুনিক জিআরআর (যে শিক্ষণ কাঠামোতে শিক্ষক ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর ওপর থেকে নিজের দায়িত্ব সরিয়ে নিয়ে তাদের স্বাধীনভাবে শিখতে সক্ষম করে তোলেন) মডেল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশুদের পঠন দক্ষতা উন্নয়নে জিআরআর মূল্যায়ন পদ্ধতি গ্র্যাজুয়াল রিলিজ অব রেসপনসিবিলিটি নামে পরিচিত। জিআরআর হলো- একটি শিক্ষণ পদ্ধতি, যেখানে শিক্ষক ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের ওপর শেখার দায়িত্ব ছেড়ে দেন। যেখানে শিক্ষার্থীরা ‘আমি করি, আমরা করি, তুমি একা করো’ (I do, we do, you do) নামে পরিচিত। নতুন এ কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীর ওপর ধীরে ধীরে দায়িত্ব বাড়িয়ে শিক্ষকের সহায়তা কমিয়ে আনা। এটি মূলত চারটি ধাপে সম্পন্ন হবে। শিক্ষক প্রথমে নিজে পড়ে শোনাবেন, এরপর শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মিলে একসঙ্গে পড়বেন, তারপর জুটিতে বা সহপাঠীরা মিলে একে অপরকে সহযোগিতা করে পড়বে এবং সর্বশেষ শিক্ষার্থী শিক্ষক বা অন্য কারও সাহায্য ছাড়াই নিজে পড়তে শিখবে। এ কৌশলে প্রথমে শিক্ষক মডেলিং করেন তারপর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের যৌথ অংশগ্রহণে অনুশীলন করানো হবে। এমন পদ্ধতি চলতি বছর থেকেই চালু করতে চায় গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম পাঠ্যপুস্তুক বোর্ড (এনসিটিবি) এমন একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে। যেই পদ্ধতি চলতি বছর থেকে চালু করা হবে। আজ মঙ্গলবার এ-সংক্রান্ত একটি বৈঠক হবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। যে বৈঠকে প্রাথমিকের মানবণ্টন চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে কিছু নোট, গাইড ব্যবসায়ী, যারা বিগত বছরের মানবণ্টনে বই ছাপিয়ে বাজারজাত করার প্রস্তুতি নিয়েছেন, তারা সেই প্রক্রিয়া আটকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২১ ডিসেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর এনসিটিবির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক পাটওয়ারী এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠান। সেখানে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন মূল্যায়ন নির্দেশিকার একটি গাইডলাইন রয়েছে। সেখানে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির মূল্যায়ন নির্দেশিকাও যুক্ত করা হয়। তার আগে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) ২০২৬ সালের বার্ষিক পাঠ পরিকল্পনায় ও সহশিক্ষা বা শিক্ষার্থীদের স্বাধীন পাঠ বা ‘জিআরআর’ মডেল এবং বহুমুখী সহশিক্ষা কার্যক্রম চালুর একটি রূপরেখা দেয়।

এ রূপরেখার সঙ্গে যুক্ত নেপের বিশেষজ্ঞরা জানান, নতুন মানবণ্টনে পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীদের সঠিক দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করা যাবে। এ ছাড়া শিশুদের শুধু অক্ষরজ্ঞানই নয়, বরং স্বাধীনভাবে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হবে। এজন্য চারটি বিশেষ পঠন কার্যক্রম চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো হলো শিক্ষকের সরব পাঠ, সবার অংশগ্রহণমূলক পড়া, জুটিতে পড়া এবং স্বাধীনভাবে পড়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রারম্ভিক স্তরে (প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণি) শিক্ষকের সহায়তায় ‘পড়তে শেখা’ এবং পরবর্তী স্তরে (তৃতীয়-পঞ্চম শ্রেণি) নিজে নিজে ‘পড়ে শেখার’ ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ পুরো প্রক্রিয়াটি ‘জিআরআর’ বা গ্র্যাজুয়াল রিলিজ অব রেসপনসিবিলিটি নামে পরিচিত। যেখানে শিক্ষকের সহায়তা ধীরে ধীরে কমিয়ে শিক্ষার্থীকে স্বনির্ভর করে তোলা হয়। সহায়ক হিসেবে এসআরএম (সাপ্লিমেন্টারি রিডিং ম্যাটেরিয়ালস) থাকবে। যেখানে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বাড়তি জ্ঞানের জন্য সরবরাহ করা হবে সম্পূরক পঠন সামগ্রী। শ্রেণিকক্ষে গল্পের বইয়ের মাধ্যমে শিশুদের পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তোলাই এর মূল লক্ষ্য। প্রতিটি বিদ্যালয়ে এই বইগুলো বিতরণের জন্য সুনির্দিষ্ট রেজিস্টার ও ‘বুক ক্যাপ্টেন’ নিয়োগের নির্দেশনা দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল মেধা বিকাশ বা পুথিগত বিদ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ১০টিরও বেশি কার্যক্রমকে পাঠ পরিকল্পনার অংশ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্বাস্থ্য ও পরিবেশ, সাংস্কৃতিক চর্চা যেমন নিয়মিত ছড়া, গান, কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন এবং একক অভিনয়। দক্ষতা উন্নয়নে সুন্দর হাতের লেখা, ইংরেজি কথোপকথন এবং উপস্থিত বক্তৃতা থাকবে। উদ্ভাবনী আইডিয়া প্রকাশ এবং দলভিত্তিক বিজ্ঞান মেলার আয়োজনও করা হবে।

জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আহসান কালবেলাকে বলেন, প্রাথমিকে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে আমূল পরিবর্তন আসবে। এই স্তরের শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও সৃজনশীল হয়ে উঠবে। তবে এটি বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নতুন পাঠ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শিক্ষকদের যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে হবে। সেটারও উদ্যোগ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে নিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে শিক্ষার্থীদের শিখন নিশ্চিত করতে আমরা একটি সমন্বিত মূল্যায়ন নির্দেশিকা পাঠিয়েছি। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা জারি করবে, আমরা শুধু বাস্তবায়ন করব।

প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল উল্লেখ করে এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, আমরা শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে একটি ‘সমন্বিত মূল্যায়ন’ নির্দেশিকা তৈরি করেছি।

নতুন পদ্ধতিতে যা থাকছে: নতুন মানবণ্টনে প্রাথমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়নের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে বলে জানা গেছে। নতুন এই মূল্যায়ন ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকায় শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা একে সময়োপযোগী ও শিক্ষার্থীবান্ধব বলে অভিহিত করছেন। নতুন মানবণ্টন প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক স্তরের শ্রেণি শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, পিটিআই ও ইউপিসি ইন্সপেক্টর, সহকারী থানা শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির প্রতিনিধি, গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, এনসিটিবির বিশেষজ্ঞ, জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির সদস্যসহ মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ ও একাডেমিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরা সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে এই মানবণ্টন ও মূল্যায়ন কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, নতুন মানবণ্টনে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীর প্রকৃত শেখা, দক্ষতা ও প্রয়োগ ক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন শিখন অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা যাবে এবং সামষ্টিক মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় শেষে শিক্ষার্থীর সার্বিক দক্ষতা নিরূপণ সম্ভব হবে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ভীতি কমে গিয়ে শেখার প্রতি আগ্রহ ও আনন্দ বাড়বে।

নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে আগে শ্রেণি কার্যক্রম থাকলেও ২০২৬ সালে সামষ্টিক মূল্যায়ন (লিখিত পরীক্ষা) যুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে শ্রেণি মূল্যায়ন এবং সামষ্টিক মূল্যায়নের সঙ্গে নতুন করে ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত করা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে ধারাবাহিক নম্বর রাখা হয়েছে ৫০ এবং লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় রাখা হয়েছে বাকি ৫০ নম্বর। এই দুই শ্রেণিতে অন্য বিষয়গুলোতে ৫০ নম্বরের মধ্যে ২৫ ধারাবাহিক মূল্যায়নে এবং ২৫ সামষ্টিক মূল্যায়নে রাখা হয়েছে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, বিজ্ঞান ও ধর্ম শিক্ষা বিষয়ে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৩০ ধারাবাহিক নম্বর এবং সামষ্টিকে (লিখিত ও মৌখিক বা ব্যাবহারিক পরীক্ষা) ৭০ নম্বর রাখা হয়েছে। শিল্পকলা এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা বিষয়ে ৫০ নম্বরের মধ্যে ধারাবাহিক মূল্যায়নে ১৫ ও সামষ্টিক মূল্যায়নে ৩৫ নম্বর রাখা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, ‘নতুন মূল্যায়ন নির্দেশকা প্রাথমিক স্তরে আমূল পরিবর্তন আনবে। আগামীকাল (আজ) এ নিয়ে একটি বৈঠক রয়েছে। আশা করি, সবাই পক্ষে মতামত দিলে চলতি বছর থেকেই নতুন মূল্যায়ন নির্দেশিকা চালু করতে পারব।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com